বাংলা শব্দভাণ্ডার হলো বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার যার মূল এবং আদি উৎস পালি এবং প্রাকৃত ভাষা দ্বারা। বাংলা ভাষাতে পরের কালে ফ়ারসী, আরবী, সংস্কৃত এবং বিভিন্ন ভাষা থেকে ঋণশব্দ এবং পুনঃঋণশব্দ গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন ভাষার সংস্পর্শে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে থেকে তাই বাংলার শব্দভাণ্ডার বর্তমানে অসংখ্য শব্দসমৃদ্ধ ও বিচিত্র।
বাংলার তৎসম শব্দ (সংস্কৃত থেকে সরাসরি গৃহীত) (৪০%)
দেশজ শব্দ (আদিবাসী বা “দেশি” শব্দ) (১৬%)
বিদেশি শব্দ (ফ়ারসী, তুর্কি, আরবী, ইংরেজ়ি, পর্তুগিজ় ইত্যাদি থেকে আগত) (২৮%)
বাংলা ভাষায় মোট শব্দের সংখ্যা প্রায় ১,০০,০০০ বলে মনে করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৬,০০০ (১৬%) শব্দ তদ্ভব বা খাঁটি বাংলা শব্দ। অর্থাৎ এগুলো হলো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ইন্দো-আর্য শব্দ। প্রায় ৪০,০০০ (৪০%) শব্দ হলো তৎসম। এগুলো সরাসরি সংস্কৃত ভাষা থেকে গৃহীত; তবে বানান একই হলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে উচ্চারণ সংস্কৃত ভাষা থেকে কিছুটা আলাদা। এছাড়া “দেশি” শব্দ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় উৎসের তথা ইন্দো-আর্য ভাষার আগমনের পূর্বে এই অঞ্চলের আদিবাসীদের ভাষা থেকে আগত[১][২][৩][৪] শব্দও প্রায় ১৬,০০০ (১৬%)। এছাড়া বাক়িগুলো 'বিদেশি' উৎসের শব্দ। এর মধ্যে আছে ফ়ারসী, তুর্কি, আরবী, পর্তুগিজ়, ইংরেজ়ি সহ নানান ভাষা। এ ধরনের বিদেশি উৎসের শব্দের সংখ্যা প্রায় ২৮,০০০ (২৮%)। এই সংখ্যা বাংলার দীর্ঘ ইতিহাসে নানা জাতি-গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের গভীরতা স্পষ্ট করে।[৫] বাংলা ভাষার অসমীয়া ভাষা সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে; প্রকৃতপক্ষে অসমীয়াই বাংলার সবচেয়ে নিকটবর্তী স্বীকৃত ভাষা। আবার নেপালি ভাষার সঙ্গে বাংলা শব্দভাণ্ডারের প্রায় ৪০ শতাংশ মিল পাওয়া যায়।[৬]
আধুনিক বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের প্রভাব অনেক বেশি। শহুরে বাঙালিদের কথ্য ভাষায় বিশেষত ইংরেজি শব্দের ব্যবহার বেশ বাড়ছে।[৭][৮] তবে ঐতিহাসিকভাবে মধ্যযুগে বাংলা ভাষার ওপর ফ়ারসী ভাষার প্রভাব ছিল সর্বাধিক। মধ্যযুগের দিল্লি ও সুবাংলার সুলতানি আমলের বহু শাসক ছিল তুর্কি ও ফ়ারসী জাতিভুক্ত ছিলেন। আবার মুঘল শাসকেরাও চাগাতাই তুর্কি জাতি থেকে আগত। তবে ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৩৭ সালে প্রশাসনিক ভাষা বদলে ইংরেজি করার আগপর্যন্ত পূর্বোক্ত মুসলিম শাসনামলে প্রায় ৬০০ বছর ধরে বাংলার প্রশাসনিক ভাষা ছিল ফ়ারসী। ফলে বাংলা ভাষার উন্নয়নে ফ়ারসী ভাষার প্রভাব আধুনিক যুগ পর্যন্তও উল্লেখযোগ্য ছিল। এটি বাংলার ব্যাকরণগত রূপকেও বেশ প্রভাবিত করেছে বলে মনে করা হয়।[৯] বাংলায় ফারসির প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে মধ্যযুগের শেষভাগে বাংলা ভাষার এক অতি-ফারসি প্রভাবিত রূপের উদ্ভব হয়, যাকে বলা হয় দোভাষী বাংলা।[১০] ঔপনিবেশিক আমলে ভাষা সংস্কারের আগ পর্যন্ত এই ভাষায় প্রচুর কিচ্ছা ও পুঁথি সাহিত্য লেখা হয়েছে। তবে মুসলিম শাসনামলে বাংলায় ফারসির পাশাপাশি বহু আরবী ও তুর্কি ভাষার শব্দ বাংলায় প্রবেশ করেছে।
এবং পরবর্তীতে প্রাক-ঔপনিবেশিক এবং ঔপনিবেশিক যুগে পর্তুগিজ়, ওলন্দাজ়, ফ়রাসি, ইংরেজ়দের মতো ইউরোপীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের ফলে বাংলা বহু বিদেশি শব্দ গ্রহণ করেছে এবং এগুলোর অনেকগুলোই বাংলা ভাষার মূল শব্দভাণ্ডারে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে।